হারাধনের দশটি ছেলের একে একে হারিয়ে যাওয়ার গল্প অনেকেরই জানা। বন্দর নগরী চট্টগ্রামের অবস্থাও যেন এমন। একসময় নগরজুড়ে ছিল দীঘি, জলাশয়, ঝরনা। বেড়ানোর জন্য ছিল প্রাণ জুড়ানো উদ্যান ও খোলা পরিসর। কালক্রমে হারিয়ে গেছে অনেক দীঘি-জলাশয়। অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না ঝরনাগুলোর। অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে হুমকির মুখে উন্মুক্ত পরিসরগুলোও। এসব নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি করেছেন সমকালের সিনিয়র রিপোর্টার
তৌফিকুল ইসলাম বাবর
‘শোন বন্ধু শোন/প্রাণহীন এই শহরের ইতিকথা/ইটের পাঁজরে লোহার খাঁচায় দারুণ মর্ম ব্যথা/এখানে আকাশ নেই/এখানে বাতাস নেই/অট্টালিকার নরকে শুধু মুক্তির আকুলতা…।’
ষাটের দশকে কলকাতা শহরকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছিল গানটি। উপমহাদেশের প্রখ্যাত শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া এ গানটি তখন আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। একবিংশ শতাব্দীতে এসে চট্টগ্রাম মহানগরের বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে ফের সামনে আনতে হচ্ছে সেই গানটিকেই। অপরিকল্পিতভাবে গড়া ওঠা অট্টালিকার ছড়াছড়িতে হারিয়ে যাচ্ছে নগরীর খোলা প্রান্তর। একে একে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে দীঘি-জলাধারগুলোও। খোলা আকাশ, আর প্রাকৃতিক বাতাস হারিয়ে নগরবাসী যেন বন্দি হয়ে পড়ছে ইট-পাথরের খাঁচায়।
অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে ইতিমধ্যেই হারিয়ে গেছে নগরের বেশিরভাগ দীঘি-জলাশয়। এগুলো ভরাট করে গড়ে উঠেছে সারি সারি অট্টালিকা। অপমৃত্যু হয়েছে নান্দনিক সৌন্দর্যের আধার হিসেবে পরিচিত উন্মুক্ত পরিসরগুলোরও। পরিস্থিতি এমন, এখন নগরের কোথাও কোনো খালি জায়গা নেই, যেখানে নিরিবিলিতে ঘুরে বেড়ানো যায়; নির্মল পরিবেশ পাওয়া যায়।
একসময় স্বাস্থ্যকর নগর হিসেবেই পরিচিত ছিল চট্টগ্রাম। বন্দর নগরীর রূপসৌন্দর্য পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। কিন্তু একের পর এক বন ও পাহাড় সাবাড় করার কারণে হারিয়ে গেছে এর সৌন্দর্য। তাই একসময় সবুজে ভরপুর এ নগরে এখন সবুজের দেখা পাওয়াই মুশকিল। দিন দিন অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে শ্রীহীন হয়ে পড়ছে নগর। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন সচেতন মহল। কিন্তু যাদের হাতে নগরের সৌন্দর্য রক্ষার দায়িত্ব তারা বলতে পারছেন না কোথায় এর শেষ, কখন আবার আগের রূপে ফিরে যাবে চট্টগ্রাম।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নগরে অতিরিক্ত যে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে এর অন্যতম কারণ নির্বিচারে জলাধার ও খোলা পরিসর ধ্বংস। এখনও যেসব জলাধার কিংবা উন্মুক্ত পরিসর টিকে আছে, সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও নতুন নতুন জলাধার খনন করা না গেলে অবস্থার পরিবর্তন হবে না। পৃথক মাস্টার প্ল্যানের আওতায় উন্মুক্ত পরিসর ও দীঘিগুলোকে বিনোদন সুবিধা দিয়ে গড়ে তোলা গেলে এগুলো ইট-পাথরের খাঁচায় বন্দি নগরবাসীর চিত্তবিনোদনের খোরাক জোগাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে দীঘি ও জলাধারের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু সেদিকে কারও ভ্রূক্ষেপ নেই। একের পর এক দীঘি ও জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র্য।
জানা যায়, প্রায় অর্ধকোটি মানুষের নগরে জলাধারের অভাবে নেই কোনো সাঁতার কাটা ও সাঁতার শেখার ব্যবস্থা। নেই মাছ শিকারের সুযোগ। জলাধার ভরাট হয়ে যাওয়ায় অগি্নকাণ্ডের সময় তা নেভাতে দেখা যাচ্ছে পানি সংকট। অথচ জলাধারগুলো বাঁচিয়ে রাখা গেলে এগুলো হতে পারত পানি সরবরাহের প্রধান উৎস।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৬১ সালে নগরের উন্নয়নে যে মহাপরিকল্পনা করা হয়, তাতে ২৬টি উন্মুক্ত পরিসর রাখার কথা উল্লেখ আছে। এক হাজার ২শ’ একর আয়তনের এ পরিসরের ২৫ শতাংশই জলাধার। এ হিসাবে এর পরিমাণ প্রায় ৫৩৩ একর। ১৯৯৯ সালে প্রণীত রেলওয়ের ভূমি জরিপে দেখা যায়, রেলওয়ের মালিকানাধীন জলাশয়ের পরিমাণ ৯২ একর। রেলওয়ের মালিকানাধীন জলাশয়ের মধ্যে ফয়’স লেক ছাড়া অন্য দীঘি-জলাশয়গুলো এখন মৃতপ্রায়।
লাল কুঠির উত্তর-পূর্ব পাশে ইংরেজ আমলের প্রথমদিকে একটি জেলখানা তৈরি করা হয়। সেই জেলখানার দেয়ালের রঙ লাল হওয়ায় এটি পরিচিত ছিল লালঘর নামে। আবার লাল কুঠির দেয়ালের রঙও ছিল লাল। বর্তমানে এটি মেট্রোপলিটন পুলিশের সদর দফতর। এটি পর্তুগিজ আমলে নির্মিত হয় বলে ধারণা করছেন ইতিহাসবিদরা। বর্তমানে এটি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) নিয়ন্ত্রণাধীন।
ইতিপূর্বে লালদীঘির একাংশ ভরাট করে সেখানে নির্মাণ করা হয় মসিজদসহ নানা স্থাপনা। দীঘির অবশিষ্ট অংশকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলে চসিক কর্তৃপক্ষ। পুকুরপাড় ঘিরে গড়ে তোলা পার্কে রয়েছে ফুল বাগান। আর দীঘির জলে রয়েছে নানা প্রজাতির দৃষ্টিনন্দন মাছ। ছোট্ট একটি জলাধারকে কীভাবে পর্যটনকেন্দ্র্রে পরিণত করা যায় এর অনন্য দৃষ্টান্ত লালদীঘি। নগরীর অন্য দীঘি-জলাধারগুলোর শ্রীবৃদ্ধিতে এটি হতে পারে মডেল।
রুবেল খান
বেশ কিছুদিন ধরেই ব্যাট হাতে দ্যুতি ছড়িয়ে যাচ্ছেন তরুণ ক্রিকেটার মমিনুল হক সৌরভ। ২০০৮ সালে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে অভিষেক হয় কক্সবাজারের এ বাসিন্দার। ইতিমধ্যে তিনি বাংলাদেশ ‘এ’ দল, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড একাডেমী ও অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে দারুণ পারফর্ম করেছেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ‘এ’ দলের বিপক্ষে ২০টি চার ও একটি ছক্কায় সাজানো ১৫০ রানের এক অসাধারণ ইনিংসও রয়েছে এ বাঁহাতি ব্যাটসম্যানের। দেশে প্রথমবারের মতো আয়োজিত টি২০ টুর্নামেন্ট বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগেও (বিপিএল) তার ব্যাটে ছিল আলোর ঝিলিক। সব ধরনের ক্রিকেটে ব্যাট হাতে উজ্জ্বল মমিনুল দৃষ্টি কেড়েছেন নির্বাচকদেরও।
সূত্র জানায়, সব ফরম্যাটের ক্রিকেটেই দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন মমিনুল। এ কারণেই জাতীয় দলের দরজায় কড়া নাড়ছেন তিনি। এমনও হতে পারে, দেশের মাটিতে শুরু হতে যাওয়া এশিয়া কাপে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে দেখা যাবে মমিনুলকে! কেননা এবার জাতীয় দল গঠনে বিপিএলে ভালো পারফর্ম করা ক্রিকেটারদের প্রাধান্য দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন নির্বাচকরা। সে ক্ষেত্রে চট্টগ্রামে অপরাজিত ৫৩ রানের টর্নেডো ইনিংস খেলে শক্তিশালী খুলনা রয়েল বেঙ্গলসের বিপক্ষে বরিশাল বার্নার্সকে অসাধারণ জয় পাইয়ে দেওয়া মমিনুলের পারফরম্যান্স বিশেষ বিবেচনার দাবিদার।
চট্টগ্রাম জহুর আহমেদ চৌধুরী বিভাগীয় স্টেডিয়ামে গত ২২ ফেব্রুয়ারি খুলনা রয়েল বেঙ্গলসের বিপক্ষে বিপিএলের ওই ম্যাচটি বরিশাল বার্নার্স জিতেছিল মূলত মমিনুলের অসাধারণ ব্যাটিংয়ের কল্যাণেই। মাত্র ২৮ বলে তিনটি চার ও চারটি ছক্কায় সাজানো তার ৫৩ রানের ঝড়ো ইনিংসের ওপর ভর করেই শক্তিশালী খুলনার বিপক্ষে খুবই জরুরি জয়টি পায় বরিশাল। এ জয় না পেলে বিপিএলে ফাইনাল খেলা তো দূরের কথা, সেমিফাইনালেই ওঠা হতো না বরিশাল বার্নার্সের।
খুলনার বিপক্ষে ওই ম্যাচে ১৬২ রান তাড়া করতে গিয়ে ৯ ওভারে ৫৩ রানেই চার উইকেট হারিয়ে বসে বরিশাল। এ অবস্থায় বরিশাল সমর্থকরা ধরেই নিয়েছিল ম্যাচ তাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ব্যাট হাতে জয়ের পণ করেই যেন নেমেছিলেন মমিনুল হক সৌরভ। তাই ব্যাটিংয়ে সৌরভ ছড়িয়ে দলকে টেনে নিয়ে যেতে থাকেন জয়ের দিকে। একেবারে অঙ্কের হিসাব কষে তিনি ব্যাট চালাতে থাকেন। দায়িত্বশীলতার চরম পরীক্ষা দিয়ে নির্ধারিত ২০ ওভারের তিন বল বাকি থাকতেই দলকে চার উইকেটের অসাধারণ জয় এনে দেন। শেষ ওভারের তৃতীয় বলে ডোয়েন স্মিথকে ছক্কা হাঁকিয়ে দলের জয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিপিএলে নিজের প্রথম ফিফটিও পূর্ণ করেন তিনি। তার এ নজরকাড়া ব্যাটিং দেখে বিমুগ্ধ ক্রিকেটপ্রেমীরা। বিশেষ করে তার অসাধারণ ম্যাচ টেম্পারমেন্ট মুগ্ধ করেছে ক্রিকেট বোদ্ধাদের। সাধারণত ম্যাচের এমন পরিস্থিতিতে চাপ সামলে স্বাভাবিক খেলাটা প্রদর্শন করাই যেখানে কঠিন, সেখানে পরিস্থিতি সামলে ছক্কা মেরে দলকে অসাধারণ জয় ‘স্পেশাল’ বটে!
চাপ সামলে অসাধারণ ব্যাটিং প্রদর্শন করার রহস্যটা ম্যাচ শেষে জানালেন ২০ বছর বয়সী এ ক্রিকেটার_ ‘পণ করে নেমেছিলাম, আমি আমার মতোই খেলব। তাতেই হয়তো হয়ে যাবে; হয়ে গেছে। না হলেও কিছু করার ছিল না। তবে ম্যাচটি জিততে পেরে সত্যিই খুব ভালো লেগেছে।’
ইতিমধ্যে মমিনুল প্রথম শ্রেণীর ১৪টি ম্যাচে একটি সেঞ্চুরি ও চারটি হাফ সেঞ্চুরিসহ ৬৪০ রান করেছেন। ব্যাটিং গড় ২৯ দশমিক শূন্য ৯। এ ছাড়া ১৫টি টি২০ ম্যাচে একটি ফিফটিসহ তার রান ২০৬। ব্যাটিং গড় ২৫ দশমিক ৭৫। প্রয়োজনে হাতও ঘোরাতে পারেন তিনি। প্রথম শ্রেণীর ম্যাচে একটি উইকেট রয়েছে মমিনুলের ঝুড়িতে।
সোনাগাজীর চর মজলিশপুরের ছোট্ট এক গ্রাম বিষ্ণুপুর। সেই গ্রামেরই এক দরিদ্র রিকশাচালক কান্তি লাল কুরি। দারিদ্র্য থাকলেও অশান্তি ছিল না কান্তি লালের পরিবারে। তবে একের পর এক দুর্ঘটনা তছনছ করে দিয়েছে তার সুখের সংসার। স্ত্রী মারা গেছেন, ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হওয়ার পর নিজেও হয়ে গেছেন বাকপ্রতিবন্ধী। এর চেয়ে করুণ ব্যাপার, তার দুই মেয়ে এবং এক ছেলেও এখন প্রতিবন্ধী!
বিষ্ণুপুর গ্রামের মনোরঞ্জন কুরির বাড়িতে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন কান্তি লাল কুরি। রিকশা চালিয়েই তিনি সংসার চালাতেন। হঠাৎ একদিন তার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েন। স্ত্রীকে সুস্থ করতে গিয়ে বিক্রি করে দেন সব সহায়-সম্বল। যে রিকশা চালিয়ে পরিবার চালাতেন সেটি বিক্রি করে দেন প্রিয় স্ত্রীকে সারিয়ে তুলতে। কিন্তু কান্তির সব চেষ্টা বৃথা করে একদিন পৃথিবীকে বিদায় জানান তার স্ত্রী।
স্ত্রীর অসুস্থতার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া কান্তির বিপদ চলছে এখনও। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর বড় মেয়ে প্রীতি রানী কুরিও আক্রান্ত হন অসুখে। একদিন দেখা গেল, প্রীতি তার চোখ দিয়ে আর দেখতে পারছে না সুন্দর পৃথিবীটাকে।
এর কিছুদিন যেতে না যেতেই অভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয় কান্তির একমাত্র ছেলে অপু চন্দ্র কুরি। অভিন্ন রোগের পরিণতিটাও হয় অভিন্ন; চিরতরে অন্ধ হয়ে গেছে অপু।
এদিকে মাত্র চার মাস বয়সেই আগুনে পুড়ে যায় কান্তির ছোট মেয়ে বীথি রানী কুরির শরীরের বিভিন্ন অংশ। সেই থেকে আর হাঁটতে পারে না বীথি।
একদিকে স্ত্রীর মৃত্যু, অন্যদিকে সহায়-সম্বল বিক্রি করে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া_ সবকিছু মিলিয়ে চিন্তিত কান্তি আক্রান্ত হন ব্রেন টিউমারে। সেই থেকে বাকপ্রতিবন্ধী হয়ে যান তিনি।
পরিবার নিয়ে কিছুদিনের জন্য কান্তির ঠাঁই হয় একই বাড়ির বাবুল চন্দ্র কুরির ঘরে। পরে সেখান থেকে তাকে চলে যেতে হয়। বর্তমানে তিনি সন্তানদের নিয়ে দাগনভূঞা উপজেলার ইয়াকুবপুর ইউনিয়নের চণ্ডীপুর গ্রামে বসবাস করছেন। যে বাসায় বসবাস করছেন তার মালিক কান্তির স্ত্রীর ভাই পরেশ বড়ূয়া।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, খুবই করুণ অবস্থায় রয়েছে কান্তি ও তার সন্তানরা। খেয়ে না খেয়ে কাটছে তাদের দিন। সরকার প্রতিবন্ধীর জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিলেও এর কিছুই পায় না তারা। প্রতিবন্ধী এ পরিবারটির সাহায্যে এগিয়ে আসেনি কোনো বেসরকারি সংস্থাও। এমনকি কোনো হৃদয়বানের সাহায্যও জোটেনি তাদের ভাগ্যে!
পরেশ চন্দ্র কুরি বলেন, বোন মারা যাওয়ার পর ভগি্নপতি বোবা হয়ে গেছেন। ভাগিনা ও ভাগি্নদের নিয়ে খুবই কষ্টে আছি। কীভাবে যে আমাদের দিন কাটছে তা একমাত্র ভগবান ছাড়া আর কেউ বলতে পারবে না।’
এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সোনাগাজী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা নাজিম উদ্দিন সমকালকে বলেন, আগামীতে প্রতিবন্ধীদের জন্য ভাতা এলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ওই পরিবারটির কথা বিবেচনা করা হবে।
নবাব আসকর খাঁ ১৬৬৯ থেকে ১৬৭১ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামের শাসনকর্তা ছিলেন। নগরীর ডবলমুরিং মৌজার আস্করাবাদ মৌজা তার নামেরই স্মারক। নিজ শাসনামলে তিনি খনন করেন ‘আসকার দীঘি’। তিনশ’ বছরেরও বেশি পুরনো দীঘিটি এখন নানাভাবে হুমকির মুখে। দীঘির চারপাশই ইতিমধ্যে দখল হয়ে গেছে। একটি প্রভাবশালী মহল দীঘির চারধারের বড় একটি অংশ দখল করে সেখানে নির্মাণ করেছে ফার্নিচারের দোকানসহ নানা স্থাপনা ও ঘরবাড়ি। এতে দীঘির একসময়ের স্বচ্ছ পানি এখন পরিণত হয়েছে বিষে।
কথিত আছে, নগরীর কোর্ট বিল্ডিংয়ের পরীর পাহাড়ের পরীরা একসময় এ দীঘির জলে স্নান করত। তাই অনেকের কাছে এটি পরিচিত ছিল ‘পরীর দীঘি’ নামেও। বর্তমানে দীঘির অবস্থা দেখলে হয়তো সেই পরীরাও লজ্জায় মুখ লুকাবে।
ঢেবা ঘিরে গড়ে ওঠা স্থাপনার কারণে এখানে সৃষ্টি হয়েছে অস্বাস্থ্যকর এক পরিবেশ। আশপাশে থাকা বস্তির মানুষ নিত্যপ্রয়োজনে পুরোপুরি নির্ভর এ ঢেবার ওপর। এতে রোগ-বালাই দেখা দিলেও অন্য উপায় না থাকায় বাধ্য হয়েই তাদের দূষিত পানি ব্যবহার করতে হয়। অন্যদিকে দিন দিন সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে আগ্রাবাদ ঢেবা। এভাবে চলতে থাকলে একসময় এটি হারিয়ে
যাবে বলে আশঙ্কা করছে স্থানীয় সচেতন মহল।
নগরের উল্লেখযোগ্য ঝরনাগুলোর মধ্যে ছিল বটতলীতে বদর ঝরনা, আন্দরকিল্লায় শীতল ঝরনা, জামালখানের দোনালা ঝরনা এবং দেওয়ানবাজারের মাছুয়া ঝরনা। এ ছাড়া চন্দনপুরায় চট্টগ্রাম কলেজ ও চট্টগ্রাম গার্লস স্কুলের পাশে দুটি ঝরনা এবং জয়নগরে একটি ঝরনা থাকার তথ্যও পাওয়া যায়।
একসময় নগরের বিশুদ্ধ খাবার পানির উৎস ছিল ঝরনাগুলো। অনেক এলাকায় সরবরাহ করা হতো ঝরনার পানি। আবার শীতল ঝরনার পানি সরবরাহ করা হতো সদরঘাট এলাকার স্টিমারগুলোতেও!
নগরের স্টেশন রোডে পর্যটন করপোরেশন পরিচালিত ভেঙে ফেলা মোটেল সৈকতের পশ্চিম পাশে ছিল বদর ঝরনার অবস্থান।
কথিত আছে, খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতকের প্রথমদিকে আরব থেকে সমুদ্রপথে পীর বদর শাহ চট্টগ্রাম আগমনের পর সেখানকার বন-জঙ্গলে তিনি এ ঝরনা আবিষ্কার করেন। পরবর্তীকালে এর নামকরণ করা হয় ‘বদর ঝরনা’। ওই সময় মানুষ বিভিন্ন রোগ থেকে মুক্তি পেতে মানত করে এ ঝরনার পানি পান করত। বর্তমানে এ ঝরনার কোনো অস্তিত্বই নেই। বিভিন্ন অবকাঠামোর আড়ালে হারিয়ে গেছে বদর ঝরনা।
তাকে শিরশ্ছেদের আদেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তার সব
সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে দুস্থদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার আদেশও দেওয়া হয়। এ সময় ওই চোর সওদাগরের বাড়িতে একটি দীঘি খনন করে দেওয়া হয়। সুলতান সে সময় দীঘিটির নাম দেন ভেলুয়ার দীঘি। দখল থেকে মুক্ত নয় ভেলুয়ার দীঘিটিও।
তবে এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন ইতিহাসবিদ ড. আবদুল করিম। তার মতে, ত্রিপুরার কোনো রাজাই দীঘিটি খনন করেন। আবার এ ইতিহাসবিদের সঙ্গে একমত হতে পারেননি আরেক ইতিহাসবিদ আবদুল হক চৌধুরী। তবে এখন সেই কমল দীঘির কোনো অস্তিত্ব নেই। তিনশ’ বছরের পুরনো কমলদহ দীঘি ভরাট করে ফেলা হয়েছে প্রায় দু’যুগ আগে। ভরাট করা সেই দীঘির ওপর নির্মিত হয়েছে আনিকা কমিউনিটি সেন্টারসহ নানা স্থাপনা।
চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের সাবেক সভাপতিও নগর বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী আলী আশরাফ সমকালকে বলেন, নগরীর দীঘি-জলাশয়গুলো ভরাট ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার মূল কারণ হচ্ছে ‘অপরিকল্পিত নগরায়ন’। ১৯৬১ ও ১৯৯৫ সালে দু’বার নগরীর উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা প্রণীত হলেও এর বাস্তবায়ন নেই। অথচ একে একে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে সব ধরনের জলাধার। এটি রোধে দেশে যুগোপযোগী কোনো আইন নেই। তাই ধ্বংসকারীরা যে যেভাবে পারছে সেভাবে জলাধার নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছে। উন্মুক্ত পরিসর ও জলাধারগুলো রক্ষায় মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিকল্প নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।
নগরীর ভিশন প্রপার্টিজের পরিচালক প্রকৌশলী মোঃ ইকবাল হোসেন বলেন, ‘নগরীর দীঘি-জলাশয়গুলো ভরাট করার পর সেখানে গড়ে তোলা হচ্ছে বহুতল ভবন। অন্যান্য উন্মুক্ত পরিসরগুলো দখলেরও মহোৎসব চলছে।’ তিনি বলেন, ‘উন্মুক্ত পরিসর ও জলাধার ধ্বংসের কারণে প্রধানত দুটি সমস্যা দেখা দেয়। জলাধার সংরক্ষণ করা গেলে বৃষ্টির সময় এগুলোতে অতিরিক্ত পানি ধারণ করা যেত এবং খোলা পরিসরগুলোর মাটি চুইয়ে বৃষ্টির পানি সহজে ভূগর্ভে চলে যেতে পারত। এতে বর্ষায় নগরীর জলাবদ্ধতা কিছুটা হল









