কায়কোবাদ #
মাত্র চার-পাঁচ বর্গকিলোমিটারের আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে ৩২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে আছে দুটি কলেজ, দুটি উচ্চবিদ্যালয়, পাঁচটি মাদ্রাসা এবং বাকিগুলো কিন্ডারগার্টেন। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনহীন এবং চলছে ভাড়া করা বাসাবাড়িতে। কোনো কোনো বাড়িতে দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা দেওয়ার নামে চলছে জমজমাট ব্যবসা। ৫০০ থেকে দুহাজার টাকা মাসিক বেতন নেওয়া হলেও মানসম্মত শিক্ষাদান এসব বিদ্যালয় বা কলেজে হয় না। প্রশ্ন রয়েছে শিক্ষকদের পাঠদানের যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতা নিয়েও।
দেখা গেছে, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শ্রেণীকক্ষ নেই। মাত্র তিন-চার কক্ষবিশিষ্ট একটি বাসাকে ভাগ করে বানানো হয়েছে শ্রেণীকক্ষ, শিক্ষকদের কক্ষ, প্রধান শিক্ষকের কক্ষ। শিক্ষার্থীদের বসতে হয় গাদাগাদি করে। এমনকি কোনো কোনো বাসার রান্নাঘর, বারান্দা, গুদাম এবং করিডোরকেও শ্রেণীকক্ষ কিংবা শিক্ষকদের কক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
আবাসিক এলাকার বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, ১৭ নম্বর সড়কে সর্বাধিক ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ ছাড়া, ১ নম্বর সড়কে ছয়টি, ৩ নম্বর সড়কে দুটি, ৪, ৮, ৯, ১৪, ১৬, ২৫ ও ২৯ নম্বর সড়কে একটি করে, ২৭ নম্বর সড়কে দুটি এবং ২৮ নম্বর সড়কে চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।
২৮ নম্বর সড়কের ৭৭ নম্বর বাড়িতে রয়েছে একসঙ্গে দুটি প্রতিষ্ঠান। দোতলা বাড়িটির নিচতলার একপাশে রয়েছে ইবনে আব্বাস মাদ্রাসা ও হেফজখানা। অন্যপাশে থাকেন বাড়িওয়ালা নিজে। দোতলায় রয়েছে লাইসিয়াম পাবলিক স্কুল নামে একটি কিন্ডারগার্টেন। স্কুলটিতে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ানো হয়। একই ভবনে একটি মাদ্রাসা থাকার পরও স্কুল প্রতিষ্ঠার কারণ জানতে চাইলে লাইসিয়াম স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষিকা দিলরুবা ইয়াসমিন বলেন, ‘এটি বাড়িওয়ালার বিষয়। তাঁরা ভাড়া পাচ্ছেন তাই স্কুল করতে দিয়েছেন।’ স্কুলের কোনো সরকারি অনুমতি নেই বলে স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি আছে।’ অনুমতি ছাড়া কীভাবে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াচ্ছেন জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষিকা এটিকে কোচিং সেন্টার বলে দাবি করেন এবং এ ব্যাপারে আর কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
নিজের বাসভবনে দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভাড়া দেওয়া প্রসঙ্গে বাড়ির মালিক ডব্লিউএম সফিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘এগুলো আগে অন্য বাড়িতে ছিল। সেখানে বৃষ্টির কারণে সমস্যা হওয়ায় তাঁদের বিশেষ অনুরোধে বাড়িভাড়া দিয়েছি।’
২৮ নম্বর সড়কের শাইনিং স্টার স্কুলটি ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও এটি এখনো চলছে ভাড়া ঘরে। জানতে চাইলে স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা খাদিজা বেগম বলেন, ‘পর্যাপ্ত অর্থের অভাব এবং জমির উচ্চমূল্যের কারণে নিজস্ব ভবন তৈরি করা সম্ভব হয়নি।’
জানা যায়, এককালীন মোটা অঙ্কের অগ্রিম এবং ভাড়াবাসার চাইতে বেশি ভাড়া পাওয়ায় বাড়িওয়ালারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে বাড়িভাড়া দিতে বেশি উৎসাহ দেখান।
তবে বিষয়টি স্বীকার করেননি সংশ্লিষ্ট বাড়ির মালিকেরা। ১৭ নম্বর সড়কের ১৩২/বি, নম্বর বাড়ির নিচতলায় রয়েছে এস আলম স্কলার স্কুল, আর দোতলায় রয়েছে একটি কোচিং সেন্টার। বাড়ির মালিক মিসেস বদরুন্নেছা বলেন, ‘এলাকায় বছরের আট মাসে, দিনে দুবার করে জোয়ারের পানি ওঠে। তাই কোনো পরিবার নিচতলা ভাড়া নিতে চায় না। বাধ্য হয়ে আমরা নিচতলা স্কুলের জন্য দিয়ে দিই।’ দোতলায় কোচিং সেন্টার ভাড়া দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি কোনো সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি।
১৬ নম্বর সড়কের একটি বাড়িতে রয়েছে সারজন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এই স্কুলটিতে কোনো রকম অনুমতি ছাড়াই দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ানো হয়। তবে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা ছাড়া আর সব পরীক্ষার (জেএসসি এবং এসএসসি) জন্য শিক্ষার্থীদের নিবন্ধন করা হয় অন্য স্কুলের নামে। এ প্রসঙ্গে প্রধান শিক্ষিকা রাহেলা বি চৌধুরী বলেন, ‘সরকারি অনুমতির জন্য আবেদন করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।’
৮ নম্বর রোডে অবস্থিত পিয়ারলেস একাডেমির এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘বাইরে থেকে বিদ্যালয়গুলোকে চাকচিক্যময় মনে হলেও পড়ালেখার মান তেমন ভালো নয়। বাসার কাছে হওয়ায় ছেলেকে ভর্তি করিয়েছি। ভালো পড়ালেখার জন্য বাসায় গৃহশিক্ষক রেখেছি।’
অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষকদের পর্যাপ্ত পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না। অনেক শিক্ষক পরীক্ষার খাতায় বেশি নম্বর কিংবা নোট দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করছেন তাঁদের কাছে প্রাইভেট পড়তে। ফলে স্কুলে কম বেতন পেলেও কোচিং ব্যবসার মাধ্যমে তা পুষিয়ে নিচ্ছেন তাঁরা।
আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকায় অনুমোদনহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক সুমন বড়ুয়া বলেন, ‘আমার জানামতে, আগ্রাবাদ মহিলা কলেজ, হাতেখড়ি কলেজ ও সিটি বিজ্ঞান কলেজ ছাড়া আর কোনো কলেজের অনুমতি নেই। অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বোর্ডের অধীনে কোনো পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার অনুমতি পাবে না। কথাটি অভিভাবকদের মনে রাখতে হবে। এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব।’
বিভিন্ন কিন্ডারগার্টেন স্কুল সম্পর্কে ডবলমুরিং থানার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তসলিম উদ্দিন বলেন, ‘সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করতে যেকোনো বিদ্যালয়ের শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় (পিএসসি) অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। সে সুযোগটিই এসব কিন্ডারগার্টেন স্কুল নিচ্ছে।’
এক আবাসিক এলাকায় ৩২ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান!
এই রিপোর্ট পড়েছেন 118 - জন









