নালিতাবাড়ী-নকলায় আওয়ামী লীগের শত্রু আওয়ামী লীগ

বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের মধ্যে শেরপুর-২ (নালিতাবাড়ী-নকলা) আসনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন রাজনৈতিক মহল। তাই প্রার্থী বাছাইয়ে বড় দুই দলই হিসাব-নিকাশ করে থাকে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে জোট, মহাজোটে কে হচ্ছেন প্রার্থী এ নিয়ে জনমনে রয়েছে ব্যাপক কৌতূহল। এখানে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা লক্ষ করার মতো। ১৯৭৯ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে মরহুম আবদুস সালাম এ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হয়ে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হন। এরপর থেকে এ আসনে যারাই নির্বাচিত হয়েছেন প্রায় সবাই মন্ত্রী, উপমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, হুইপের মতো সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

নকলা-নালিতাবাড়ী দুই উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে আওয়ামী লীগে ঐক্য নেই প্রায় ২০ বছর ধরে। নেই পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থা। বিশেষ করে নালিতাবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগেও আছে বিভেদ ও পরস্পরকে কোণঠাসা করার রাজনীতি। ফলে নেতাকর্মীদের মধ্যে বেড়েছে দূরত্ব ও হতাশা। এলাকার এমপি ও কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, সাবেক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও বর্তমানে জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য বদিউজ্জামান বাদশা এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হালিম উকিল এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোকসেদুর রহমান লেবুর মধ্যকার অদৃশ্য টানাপড়েনে এখানকার আওয়ামী লীগ বহুধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। আর বিভক্তির পুরো সুবিধা কাজে লাগিয়ে বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান ও পুরুষ ভাইস চেয়ারম্যানের পদটি ছিনিয়ে নিয়েছে বিএনপি। একই কারণে বিগত পৌর মেয়রের পদটিও ছিল বিএনপির দখলে। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে চলা এখানকার আওয়ামী লীগের এই বিভেদ ও বিভক্তির রাজনীতির লাগাম এখনই টেনে ধরা না হলে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে স্থানীয়দের ধারণা।

আওয়ামী লীগের এ বিভেদও কাজে লাগাতে চায় বিএনপি। বিএনপির মধ্যে অভ্যন্তরীণ কিছু বিভেদ থাকলেও জাতীয় নির্বাচনে তার কোনো প্রভাব পড়ার আশঙ্কা নেই বলে স্থানীয় নেতারা মনে করেন। যে কারণে নেতাকর্মীরা থাকেন ফুরফুরে মেজাজে।

এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশীরা হলেন- আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, সাবেক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য বদিউজ্জামান বাদশা এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোকসেদুর রহমান লেবু।

বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশীরা হলেন- জাতীয় সংসদের সাবেক হুইপ ও সাবেক এমপি মরহুম জাহেদ আলী চৌধুরীর ছেলে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার ফাহিম চৌধুরী, বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার হায়দার আলী ও নালিতাবাড়ী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোখলেছুর রহমান রিপন ও জহিদুর রহমান শ্যামল।

জাতীয় পার্টি (এরশাদ) থেকে সাবেক মন্ত্রী ও এমপি মরহুম আব্দুস সালামের ছেলে জেলা জাতীয় পার্টির সহ-সভাপতি শওকত সাঈদ ও জাতীয় পার্টি নির্বাহী কমিটির সদস্য তালুকদার রোজী সিদ্দিকীর নাম শোনা যাচ্ছে।

সূত্র মতে, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ক্ষমতার ভাগবাটোয়ারাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় আওয়ামী লীগে বিভক্তি ছড়িয়ে পড়ে। সে সময়ের এমপি ও কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরীর সুনজরে থাকা তৎকালীন কেন্দ্রীয় কৃষক লীগ নেতা বদিউজ্জামান বাদশা এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হালিম উকিলের দ্বন্দ্বের বলি হন উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ চকন ও সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ আলী। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এর প্রভাব পড়ে। এ নির্বাচনে সামান্য ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বেগম মতিয়া চৌধুরীকে চারদলীয় জোট প্রার্থী বিএনপির জাহেদ আলী চৌধুরীর কাছে পরাজিত হতে হয়। পরে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বেগম মতিয়া চৌধুরী পুনরায় বিজয়ী হন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বেগম মতিয়া চৌধুরী আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয় নিজ দলের স্বতন্ত্রপ্রার্থী বদিউজ্জামান বাদশার সঙ্গে। তবে নির্বাচনের দিন ভোট ডাকাতির অভিযোগ এনে বেলা ১১টায় বাদশা নির্বাচন বর্জন করেন। বেগম মতিয়া চৌধুরী চতুর্থবারের মতো এলাকার এমপি নির্বাচিত হন। কিন্তু ১৯৯৬ সাল থেকে যে বিভেদ আর বিভক্তির রাজনীতি শুরু হয়েছিল তার ধারাবাহিকতা এখনো চলছে। বর্তমানে স্থানীয় আওয়ামী লীগ গ্রুপ উপগ্রুপে বিভক্ত হয়ে বিভক্তির ধারাবাহিকতাকে আরো প্রকট করে তুলেছে। বর্তমানে একদিকে বদিউজ্জামান বাদশা দলের মনোনয়ন পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। একইসঙ্গে দলের অনিয়মের প্রতিবাদ ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য মাঠে রয়েছেন সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোকসেদুর রহমান লেবু। তিনি তৃণমূলের নেতাকর্মীকে সক্রিয় রাখার জন্য দেশরতœ জনঐক্য পরিষদ গঠন করে গণসংযোগ করে যাচ্ছেন শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত। তার সঙ্গে আছে স্থানীয় নেতাকর্মী ও শ্রমিক সংগঠন। অপরদিকে এমপি ও কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী চলছেন নিজস্ব গতিতে। তিনি এখানে উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন করে দিয়েছেন। তার নির্দেশ মতো দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রম ও এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এখানেও নেতাকর্মীদের মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের অভাব রয়েছে এবং দূরত্ব বাড়ছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। এমন বাস্তবতায় আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এখনই অনেক নেতাকর্মী এবং সাধারণ ভোটার শঙ্কিত। আওয়ামী লীগের কেউ কেউ নালিতাবাড়ীর সন্তান পরিচয় দিয়ে বদিউজ্জামান বাদশাকেই আগামীতে এমপি হিসেবে দেখতে চান। আবার উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোকসেদুর রহমান লেবু তার নেতাকর্মী এবং স্থানীয় শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। করছেন জনসভা ও স্থানীয় কমিটি।

উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও যুগ্ম আহ্বায়কের মধ্যে কিছু কোন্দল থাকলেও স্থানীয় পদ-পদবি নিয়েই তা সীমাবদ্ধ। জাতীয় নির্বাচনে এর কোনো প্রভাব পড়বে না বলে মনে করছেন স্থানীয় বিএনপির নেতারা। জাতীয় নির্বাচনে যেই মনোনয়ন পাবেন তার পক্ষে সবাই মিলে নির্বাচনে অংশ নেবেন।

এ প্রসঙ্গে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য সরকার গোলাম ফারুক বলেন, স্থানীয় আওয়ামী লীগকে রক্ষার জন্য এখন স্থানীয় নেতৃত্ব প্রয়োজন। হায়ার করা নেতা দিয়ে আর চলে না।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আবদুল হালিম উকিল ঐক্যবিনাশী বিভেদ দূর করার দাবি জানিয়ে বলেন, দলের স্বার্থেই নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করা উচিত।

অন্যদিকে বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ফজলুল হক আওয়ামী লীগের ভেতরকার সব দ্বন্দ্ব ও অনৈক্যের কথা অস্বীকার করে বলেন, যারা স্থানীয় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার দিবাস্বপ্ন দেখছেন, তারা আসলে স্থানীয় আওয়ামী লীগের ক্ষতি করছেন।55

এই আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য দলের চোখে পড়ার মতো তেমন কোনো কর্মকাণ্ড নেই বললেই চলে।

 এই রিপোর্ট পড়েছেন  250 - জন
 রিপোর্ট »মঙ্গলবার, ১৯ সেপ্টেম্বার , ২০১৭. সময়-১:৪১ pm | বাংলা- 4 Ashin 1424
WEBSBD.NET
রিপোর্ট শেয়ার করুন  »
Share on Facebook!Digg this!Add to del.icio.us!Stumble this!Add to Techorati!Seed Newsvine!Reddit!

Leave a Reply

3 + 4 =  

Chief Editor : Ln. Advocate Ferdaus Ahmed Asief  » E-mail :japaeditor82@gmail.com, abbokul@yahoo.com  » Mobile: 01765-375401, 01716-186230, Copyright © 2011 » All rights reserved.
☼ Provided By  websbd.net  » System  Designed by HELAL .
GO TOP
☼ Provided By  websbd.net  » System   Designed by HELAL .