রাবাহিকতা বজায় রাখতে চায় আওয়ামী লীগ : পুনরুদ্ধার চায় জাতীয় পার্টি

টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসনে আগামী সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা ব্যাপক গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। নির্বাচনের প্রায় এক বছর বাকি থাকলেও জোরেশোরে বইতে শুরু করছে এ আসনে নির্বাচনী হাওয়া। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীরা প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। বিভিন্ন শুভেচ্ছা জানিয়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির মনোনয়ন প্রত্যাশীরা ব্যানার, ফেস্টুন টাঙিয়ে জানান দিচ্ছেন আগামী সংসদ নির্বাচনের। তবে এ আসনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি ছাড়া অন্যান্য দলের প্রার্থীদের কোনো তৎপরতা নেই।3-74

টাঙ্গাইল-৫ সংসদীয় আসনের ১২ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় মোট ভোটার ৩ লাখ ৭৬ হাজার ৫৭৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮৭ হাজার ৩১৪ এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৮৯ হাজার ৩৬৫ জন। এই আসন থেকে ১৯৭০ ও ১৯৭৩ সালে এমপি ছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্র ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল মান্নান, ১৯৭৯ সালে ছিলেন আওয়ামী লীগের আব্দুর রহমান, ১৯৮৬ সালে ছিলেন জাতীয় পার্টির মীর মাজেদুর রহমান, সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে জাতীয় পার্টিতে যোগদান করে ১৯৮৮ ও ১৯৯১ সালে এমপি হন মেজর জেনারেল (অব.) মাহমুদুল হাসান, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের আবদুল মান্নান, জাতীয় পার্টি থেকে বিএনপিতে যোগদান করে মনোনয়ন নিয়ে ২০০১ সালে আবারো এমপি হন মাহমুদুল হাসান, ২০০৮ সালে মহাজোটের প্রার্থী হয়ে জাতীয় পার্টির আবুল কাশেম ও ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের ছানোয়ার হোসেন এমপি নির্বাচিত হন।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী আব্দুস ছালাম চাকলাদার তার মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিলে আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক ছানোয়ার হোসেন মনোনয়ন পান। নির্বাচনে তিনি জয়লাভ করে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড করে ইতোমধ্যে সাধারণ মানুষের মনে ঠাঁই করে নিয়েছেন। সপ্তাহের চার দিনই তিনি তার সংসদীয় এলাকায় সময় দেন। তৃণমূল কর্মীদের সঙ্গে রয়েছে তার ব্যাপক যোগাযোগ। গণসংযোগ করছেন প্রতিনিয়ত। উজ্জ্বল ভাবমূর্তি ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতিক হিসেবে দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝে তার সুনাম রয়েছে। রাজনৈতিক দলাদলি যাই থাকুক না কেন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেলে তিনি নির্বাচনী বৈতরণী পার হবেন বলে জানান আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।

এ ব্যাপারে ছানোয়ার হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন পর এই সদর আসন আওয়ামী লীগের হাতে এসেছে। অতীতে এখান থেকে যারাই এমপি-মন্ত্রী হয়েছেন তাদের সঙ্গে ঢাকা গিয়ে কর্মীদের দেখা সাক্ষাৎ করতে হয়েছে। বর্তমান এমপি কর্মী ও জনগণের দোড়গোড়ায় গিয়ে কড়া নাড়েন। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী উন্নয়মূলক কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছি। শতভাগ সফল হয়েছি বলব না। তবে আগামীতে মনোনয়ন পেলে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে এই সদর আসনটি আবারো উপহার দিতে পারব।

এছাড়া টাঙ্গাইল পৌরসভার তিনবারের মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জামিলুর রহমান মিরণ এবং সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদের স্ত্রী ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নাহার আহমেদ এ আসনে মনোনয়ন চাইবেন। এ জন্য তারা নির্বাচনী এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।

সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী এবং কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকীর ছোট ভাই মুরাদ সিদ্দিকী মাঠে রয়েছেন। তিনি এ আসনে শক্ত একজন প্রার্থী। নির্বাচনী এলাকায় সভা সমাবেশ ও উঠান বৈঠক করছেন। সাধারণ জনগণের মাঝে রয়েছে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা। আগামী সংসদ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগ অথবা স্বতন্ত্র যে দল থেকেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করুন না কেন তার বিজয় নিশ্চিত বলে জানান তার স্থানীয় ভোটাররা। এদিকে তিনি আওয়ামী লীগে যোগদানের জন্য ইতোমধ্যে দলের উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। মুরাদ সিদ্দিকীর প্রতি রাজনৈতিক ছায়া রয়েছে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জোয়াহেরুল ইসলাম জোয়াহেরের। নেতাকর্মীদের মাঝে গুঞ্জন রয়েছে তিনি দ্রুতই আওয়ামী লীগে যোগ দিচ্ছেন।

মুরাদ সিদ্দিকী বলেন, আমি আওয়ামী পরিবারের সন্তান। এর বাইরে কখনই ছিলাম না। ১৯৯৮ সাল থেকে নির্বাচনের মাঠে রয়েছি। তিনবার নির্বাচন করে সামান্য ভোটের ব্যবধানে হেরেছি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে তো আমাকে হারিয়ে দেয়া হয়েছে। জননেত্রী শেখ হাসিনা আমার নেত্রী। নেত্রী যদি আমাকে দলে যোগদান করার সুযোগ দেন তাহলে একজন কর্মী হিসেবে এলাকার জনগণের সেবা করার পথ সুগম হবে।

২০০৮ সালে জাতীয় পার্টির আবুল কাশেম মহাজোট থেকে নির্বাচিত হওয়ার পর টাঙ্গাইল সদর আসনের পুরো কর্তৃত্ব চলে আসে মূলত আওয়ামী লীগের খান পরিবারের হাতে। শহরে তারা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে। খান পরিবারের চার ভাইয়ের নিয়ন্ত্রণে চলে সবকিছু। ২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে এমপি ছানোয়ার হোসেনের জয়ের পেছনেও তারা ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন। আওয়ামী লীগ নেতা মুক্তিযোদ্ধা ফারুক হত্যা মামলায় এমপি আমানুর রহমান খান রানা কারাগারে ও তিন ভাই টাঙ্গাইল ছেড়ে চলে গেলে জেলার রাজনীতির ব্যাপক পট পরিবর্তন ঘটে। জেলা আওয়ামী লীগের একটি অংশ চান মুরাদ সিদ্দিকী আওয়ামী লীগে যোগদান করে মনোনয়ন পেয়ে এমপি নির্বাচিত হলে ভবিষ্যতে খান পরিবারের বিরুদ্ধে শক্ত একটি অবস্থান নিতে পারবে। আওয়ামী লীগের অপর অংশের মতামত দীর্ঘদিন পর আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে ছানোয়ার হোসেন এ আসনটি উদ্ধার করেছেন। তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার ভালো একটি অবস্থান রয়েছে। জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে না দিয়ে তাকে মনোনয়ন দিলে আবারো নৌকার বিজয় ছিনিয়ে এনে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে উপহার দিতে পারবেন বলে তারা মনে করেন।

এ বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জোয়াহেরুল ইসলাম জোয়াহের বলেন, এ বিষয়ে মন্তব্য করার সময় এখনো আসেনি। তবে কর্মী বিচ্ছিন্ন কোনো নেতাকে দল যদি মনোনয়ন দেয় সে ক্ষেত্রে আশানুরুপ কোনো ফল বয়ে আনবে না। তবে দলীয় নেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা যাকে মনোনয়ন দেবেন আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে তার পক্ষে কাজ করে বিজয় ছিনিয়ে আনব।

এদিকে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে সাংগঠনিক ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে। তৃণমূল পর্যায়ের সাধারণ নেতাকর্মীরাও হয়ে পড়েছে দ্বিধাবিভক্ত। জেলা বিএনপির নতুন কমিটির কয়েক নেতাকে চ্যালেঞ্জ করে ইতোমধ্যে দল থেকে চার নেতা পদত্যাগ করেছেন। পদবঞ্চিত নেতারা প্রায় প্রতিদিন জেলা বিএনপির নতুন কমিটির বিরুদ্ধে মিছিল সমাবেশ করছেন। এ ছাড়া জেলা যুবদলে কমিটি ভেঙে দিয়ে আগুনে ঘি ঢেলে দেয়া হয়েছে। কোন্দল আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে। এমতাবস্থায় নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী কতটুকু সুবিধা করতে পারবে এমনটাই প্রশ্ন জেলা বিএনপির অনেক নেতাকর্মীর। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফরহাদ ইকবাল কোন্দলের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা রয়েছে। দলে কোনো কোন্দল নেই। আর সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে ইতোমধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো পুনর্গঠন করছি। নির্বাচনে যেই মনোনয়ন পাক দলের সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করবে।

বিএনপির মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন মেজর জেনারেল (অব.) মাহমুমদুল হাসান। তবে তার বিরুদ্ধে নেতাকর্মীদের রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। জাতীয় পার্টি থেকে আসা বিএনপির নেতাকর্মী ছাড়া তিনি কাউকে মূল্যায়ন করেন না। বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার যোগাযোগ খুবই কম। কালেভদ্রে নির্বাচনী এলাকায় পা রাখেন এমন অভিযোগ করেন বিএনপি দলীয় অনেক নেতাকর্মী। বিএনপির বেশিরভাগ নেতাকর্মী চাচ্ছেন নতুন মুখ নির্বাচনে আসুক। সেই হিসেবে তারা চাচ্ছেন কেন্দ্রীয় যুবদলের সাধারণ সম্পাদক ও ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে। এ বিষয়ে মেজর জেনারেল (অব.) মাহমুমদুল হাসানের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি নির্বাচনের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবেন না বলে জানান। সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, ২০০৮ সালে আমি গোপালপুর-ভুঞাপুর থেকে নির্বাচন করেছিলাম। ওই আসনটি থেকে আমার বড় ভাই আব্দুস সালাম পিন্টু বারবার নির্বাচন করে এমপি, মন্ত্রী হয়েছেন। আইনগত কোনো জটিলতা না থাকলে এবারো বড় ভাই ওই আসন থেকে নির্বাচন করবেন। সে ক্ষেত্রে আমি টাঙ্গাইল সদর আসনে মনোনয়ন চাইব।

মহাজোটে থেকেও টাঙ্গাইলে সাংগঠনিক কোনো ভিত্তি নেই জাতীয় পার্টির। নির্বাচনী কৌশলগত কারণে আওয়ামী লীগ এই আসনটি জাতীয় পার্টিকে ছাড় দিয়ে আসছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির (এরশাদ) আবুল কাশেম মহাজোট থেকে এমপি নির্বাচিত হন। বিল খেলাপির কারণে এমপি পদ হারান। ২০১৪ সালে জাতীয় পার্টির (এরশাদ) জেলা শাখার সভাপতি আব্দুস সালাম চাকলাদার মনোনয়ন পত্র জমা দিলেও পরে পার্টির সিদ্ধান্তে তা প্রত্যাহার করে নেন। পরবর্তী সময়ে আবুল কাশেম সভাপতি ও মোজাম্মেল হক সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। আবুল কাশেম ও আব্দুস সালাম চাকলাদার দু’জনেই মনোনয়ন প্রত্যাশী বলে জানা গেছে। আব্দুস সালাম চাকলাদার বলেন, দলের কর্মীদের সঙ্গে আবুল কাশেমের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। গতবার আমি মনোনয়ন পেয়েছিলাম। এবারো সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আমাকেই প্রার্থী করবেন। এ বিষয়ে জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি আবুল কাশেম বলেন, টাঙ্গাইল সদর আসন জাতীয় পার্টির। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট হলে অবশ্যই এই আসনটি জাতীয় পার্টির জন্য ছেড়ে দিতে হবে। আমি এমপি ছিলাম। জনগণের জন্য কাজ করেছি। আমার কাজের মূল্যায়ন করে আমাকে মনোনয়ন দিলে বিজয় নিশ্চিত বলে তিনি জানান। জেলার সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হকও মনোনয়নের সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছেন। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ টাঙ্গাইল জেলা শাখার সভাপতি খন্দকার ছানোয়ার হোসেন আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হবেন বলে জানিয়েছেন। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে পীরজাদা শফীউল্লাহ আল মুনীর নির্বাচনী মাঠ চড়ে বেড়াচ্ছেন।

 এই রিপোর্ট পড়েছেন  190 - জন
 রিপোর্ট »বুধবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী , ২০১৮. সময়-২:৫৬ pm | বাংলা- 2 Falgun 1424
WEBSBD.NET
রিপোর্ট শেয়ার করুন  »
Share on Facebook!Digg this!Add to del.icio.us!Stumble this!Add to Techorati!Seed Newsvine!Reddit!

Leave a Reply

4 + 1 =  

Chief Editor : Ln. Advocate Ferdaus Ahmed Asief  » E-mail :japaeditor82@gmail.com, abbokul@yahoo.com  » Mobile: 01765-375401, 01716-186230, Copyright © 2011 » All rights reserved.
☼ Provided By  websbd.net  » System  Designed by HELAL .
GO TOP
☼ Provided By  websbd.net  » System   Designed by HELAL .